ব্রেকিং নিউজঃ
 
Sat, 23 Sep, 2017

 

 

 

 

     
 

মীর মশাররফ হোসেনের কবিতায়: বাংলার মুসলমানদের পতনের ইতিহাস

বাংলাদেশ বার্তা ২৪.কম/ সাহিত্য/ ৩০ আগস্ট/ ব্রিটিশআমলের ইতিহাসে মুসলমান সমাজের নেতৃস্থানীয় এমন বহু ব্যক্তির দেখা মেলে, যারা তাদের জীবনের শুরুর দিকে হিন্দুপ্রীতি লালন করতেন। কিন্তু সময়ের সাথেসাথে তাদের অভিজ্ঞতা যতো পোক্ত হতে থাকে, ততোই তারা হিন্দুদের কুটিলমন-মানসিকতার স্বরূপ বুঝতে সক্ষম হন এবং

হিন্দুদের থেকে দূরে সরে আসেন।শুধু তাই নয়, তারা মুসলমান সমাজকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে হিন্দুদেরসংশ্রব ত্যাগ করার উপদেশ দিয়েছিলেন।এরূপ ব্যক্তিদের মধ্যেরয়েছে স্যার সৈয়দ আহমদ খান, মীর মশাররফ হোসেন, মুহম্মদ আলী ও শওকত আলীভ্রাতৃদ্বয়, মুহম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে শুরু করে আরো অনেকে। বলাবাহুল্য, তাদের প্রত্যেকেরই আক্বীদাগত ত্রুটি ছিল। জিন্নাহ এবং মীর মশাররফ ছিল শিয়াএবং মদ খেতে অভ্যস্ত। যার ফলে তারা ধার্মিক মুসলমান সমাজ অপেক্ষা হিন্দুদেরসাথেই বেশি হৃদ্যতা অনুভব করতো। কিন্তু হিন্দুদের কুটিলতা, শঠতা ও মুসলিমবিদ্বেষ ঐসব গুমরাহ ব্যক্তিকেও আস্তে আস্তে হিন্দুদের প্রতিবিষিয়ে তোলে। মীর মশাররফ হোসেন প্রথমদিকে এতোটাই হিন্দুপ্রীতিতে আচ্ছন্নছিলো যে, সে গো-জীবননামক একটি প্রবন্ধ লিখে মুসলমানদের গরু জবাই করাত্যাগ করার উপদেশ দিয়ে। এ কারণে মীর মশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে মুরতাদ হওয়া ওস্ত্রী তালাক হওয়ার ফতওয়া জারি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতেজীবনের অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে মীর মশাররফ হোসেনের চোখে হিন্দুদের শঠতা ওকুটিলতার প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে। ১৮৯৭ সালে বর্তমান মুসলমান সমাজের একখানিচিত্রনামক একটি লম্বা কবিতা লিখে মীর মশাররফ হোসেন। কবিতাটি মীর মশাররফহোসেনের আত্মজীবনী গাজী মিয়াঁর বস্তানীর শেষাংশে সংযোজিত হয়। একশ বছরেরওবেশি সময় আগে কবিতাটি লেখা হলেও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এখনো তাপ্রাসঙ্গিক। কবিতার শুরুতে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রিটিশ আমলে অভিজাতমুসলমানদের করুণ অবস্থার কথা। তারা এবং তাদের পূর্বপুরুষরা যে অট্টালিকায়বাস করতো, তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং তারা কুঁড়েঘরে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে-

“-দ্বিতল ত্রিতল ঘর

খাড়া আছে ভিত্তি পর

সুর্কি চুন খসিয়া পড়েছে।

-জানালা কপাট ভাঙা

ভেঙে পড়ে ইট রাঙা

কত গাছ শিকড় ছাড়িছে

-চামচিকে আরশুলা

দিনকানা পেঁচাগুলা

গিরগিটি জেঠী করে বাস

-যাদের বাসের কথা

কুঁড়ে বেঁধে আছে তথা

দালানের এপাশ ওপাশ।

মুসলমান অভিজাত পরিবারের সন্তানেরা সহায়সম্বল সব হারিয়ে কাঠ কেটে হাটে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ এ হাট তাদেরই ছিল-

“-কাঁটায় চিরিছে গা

কুড়ালে কাটিছে পা

শিরে কাট, ফিরে সারা হাট।

-এ হাট তাদেরি ছিল

ফাঁকি দিয়ে কেড়ে নিল

পুরাতন নায়েবের ভাই

-পৈত্রিক বসত বাড়ী

পুষ্করিণী গোলাবাড়ী

কিনিয়াছে তাহার জামাই

-প্রথমেতে ছুঁচ হয়ে

পশে হিন্দু রয়ে রয়ে

মুসলমান জমিদার ঘরে

-ক্রমে চেপে বসে ঘাড়ে

সাধ্য নাই মাথা নাড়ে

ফালহয়ে ফাড়ে চেড়ে পরে।

অর্থাৎহিন্দুরা মুসলমানদের মধ্যে ছুঁচহয়ে ঢুকে ফালহয়ে বের হয়েছে। হিন্দুনায়েবের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবার তাদের জমিদারীহারিয়েছে। কিন্তু এই হিন্দু নায়েবকে তো তারাই মাথায় তুলেছিল তার তোষামোদিতেভুলে-

“-সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়

জোড় হাতে কথা কয়

তোষামোদে বড় বাহাদুর।

-গ-মূর্খ জমিদার

ফুলে হলো ঢোলাকার

শুনিতেও ভাল লাগে কানে

-আগ পাছ নাহি চান

আহলাদেতে গলে যান

খাবি খান খুশির তুফানে

-যদি বলি জল উচা

বলে হিন্দু তাই সাচা

প্রতিবাদ করে না কাহার

-বিদ্যাহীন বুদ্ধিহীন

একেবারে অর্বাচীন

বাঙ্গালার সব জমিদার।

মীরমশাররফ হোসেনের লেখা এই কবিতাটির বর্ণনা কাল্পনিক নয়, বরং তৎকালীন সময়েরকঠিন বাস্তব। উইলিয়াম হান্টারের লেখা দি ইন্ডিয়ান মুসলমানসবইতেওসম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে।চিরস্থায়ী বন্দোবস্তএর ফলে যে মুসলমান জমিদারের হিন্দু কর্মচারী-নায়েবরামালিককে সরিয়ে নিজেরাই জমিদারীর মালিক হয়েছিল, তা চরম মুসলিমবিদ্বেষীহান্টারও তার উক্ত বইতে স্বীকার করতে দ্বিধা করেনি।হিন্দুদেরতোষামোদি মনোবৃত্তির যে বর্ণনা মীর মশাররফ হোসেন দিয়েছিল, তা সব সময়েরজন্যই সত্য। আমার এক পরিচিত ব্যক্তি, যিনি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে উচ্চপদেকর্মরত। তিনি বলেছেন, তার নীচের পোস্টের হিন্দুটি তার চেয়ে বেশি বেতন পায়।কারণ সেই হিন্দুটি মালিককে তোষামোদ করে বলে, “স্যার, আপনিই তো আমারঅন্নদাতা’!”

এসব তোষামোদির মূল উদ্দেশ্য, মালিক যেন তার ব্যবসারনিয়ন্ত্রণ হিন্দুটির হাতে তুলে দেয়। আমাদের দেশের বহু গার্মেন্টসফ্যাক্টরী, যেগুলো আগে এদেশের ব্যবসায়ীদের মালিকানায় ছিল, তা এখন ইন্ডিয়ানমালিকানার অধীনে চলে গিয়েছে। কারণ ইন্ডিয়ান হিন্দুদের তোষামোদিতে ভুলেএদেশীয় মালিক তার ব্যবসার কলকাঠি হিন্দুদের হাতে তুলে দিয়েছিল। তৎকালীনসময়ের অর্বাচীন জমিদারদের সাথে বর্তমান সময়ের অর্বাচীন ব্যবসায়ীদের কোনোপার্থক্য নেই। এর ফলে সে সময়ে মুসলমানরা রাজা-বাদশা থেকে পথের ফকির হয়েছিল, যার বর্ণনা দিয়ে মীর মশাররফ হোসেন আরো লিখেছে-

“-যাহারা দেশের মান

মানি মধ্যে মান্যমান

ছিল মান সম্ভ্রম প্রচুর।

-তাদের তনয় যারা

আরদালি হরকরা

হইয়াছে মুটিয়া মজুর।

-ডেপুটির পুত্র হয়ে

ডেপুটির বাক্স লয়ে

পালকির আগে আগে ধায়।

-মুন্সেফের সন্তান

মারিয়া তামাকে টান

বাজারেতে টিকে বেঁচে খায়।

-কটিতে কাপড় আঁটা

হাতেতে বাঁশের ঝাঁটা

যায় কাঁটা ফেলিতে পথের

-জিজ্ঞাস তাঁহার ঠাঁই

পরিচয় পাবে ভাই

সে যে পৌত্র কোন নবাবের।

-দেখ দিল্লী লক্ষৌ গিয়ে

আছে ভস্মে আচ্ছাদিয়ে

কত মহামূল্য রত্নধন

-শাহানশার বংশধর

পান বেচে করে ঘর

কোচয়ানী করে কোন জন।

নবাবেরনাতির ঝাড়ুহাতে পথের কাঁটা ফেলা, কিংবা বাদশাহর বংশধরদের পান বেচে সংসারচালানোর দৃশ্যগুলো কবির কল্পনা নয়, বরং ইতিহাসের চরম বাস্তব। কিন্তু বাংলা ওপাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের এই দুরবস্থার কারণ কী ছিল? মীর মশাররফহোসেনের আরো বলেছে-

“-বঙ্গের বুনেদী দল

গেছে সব রসাতল

কেহ মরা কেহ আধমরা

-গেছে সব হিন্দু ঘরে

কেহ না তা দৃষ্টি করে

আরও মুখে বলে ভালো তারা

-একবার মাথা তুলে

দেখ ভাই চক্ষু মেলে

মুসলমান কিসে হল সারা।

-জমিদারী কোথায় গেল

সোনারূপা কি হইল

এত ঘর কিসে গেল মারা।

মীরমশাররফ হোসেনের উদাত্ত আহবান, হে মুসলমান, দেখো, জাগো, বুঝতে চেষ্টা করো, কারা তোমাদের চোখে ধুলো দিয়ে তোমাদের ধনসম্পদ কেড়ে নিচ্ছে? কাদের ষড়যন্ত্রেমুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো আজ পথে বসেছে? কবিতার শেষে মীরমশাররফ হোসেন একটি চরম সত্য উচ্চারণ করেছেন। আমাদের গতানুগতিক মিডিয়া ওইতিহাস বইগুলোতে কথিত হিন্দু জমিদারদেরকে বিরাট কিছু হিসেবে তুলে ধরা হয়।কিন্তু জমিদার পরিবারের সন্তান মীর মশাররফ হোসেন তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেবলেছেন, এই যতো কথিত হিন্দু জমিদার দেখছো, তাদের প্রত্যেকে অর্থশালী হয়েছেপ্রতারণার মাধ্যমে মুসলমানদের ধনসম্পদ কেড়ে নিয়ে-

“-দেখ যত হিন্দু ঘর

কিসে হল ধনেশ্বর

খোঁজ দেখি কারণ ইহার

-প্রতি মুসলমান ঘরে

চাকুরীর সাজ পরে

সর্বনাশ করিল সবার।

চাকরিরসাজ পরে হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের সর্বনাশের ধারাবাহিকতা কী এখনো শেষহয়েছে? তৎকালীন সময়ের মুসলমানরা শিক্ষা নেয়নি, আজও নিচ্ছে না। বর্তমানক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ঠিক অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তিই করছে, প্রশাসনেগণহারে হিন্দুতোষণে মত্ত হয়েছে।কিন্তু এর ফলশ্রুতিতে ঐসবআওয়ামী মন্ত্রী-আমলাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদেরকেই পিয়ন-আর্দালির পর্যায়েনেমে আসতে হবে, যেভাবে একদা নবাবের পুত্রকে ঝাড়ুদার হতে হয়েছিল, বাদশাহরপুত্রকে হতে হয়েছিল পানের দোকানদার। ইতিহাসের কিন্তু বারবার পুনরাবৃত্তিহয়, ইতিহাস কিন্তু কাউকে ক্ষমা করে না।

সংবাদ শিরোনাম